Coxs Bazar News Today
ঢাকাবুধবার , ১৭ মে ২০২৩
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আন্তর্জাতিক
  4. কক্সবাজার
  5. খেলাধুলা
  6. গ্রিস
  7. চট্টগ্রাম
  8. জলবায়ু
  9. জাতীয়
  10. তথ্যপ্রযুক্তি
  11. ধর্মীয়
  12. প্রবাস
  13. বিনোদন
  14. যুক্তরাষ্ট্র
  15. রাজনীতি

সেন্টমার্টিনে মোকার ক্ষতের দাগ

বার্তা পরিবেশক
মে ১৭, ২০২৩ ৪:১৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সেন্টমার্টিনের কোনারপাড়ায় মরিয়ম খাতুনের ছোট্ট ঘর যেন এখন ভাঙা হাট। বাঁশের ওপর কালো পলিথিনের ত্রিপল দিয়ে কোনোমতে ঢেকে রেখেছেন ঘরের চালা। দুই কক্ষের ঘরের মূল অংশ পুরোটাই ঝড়ে উড়ে গেছে। ঘরে চার ছেলেমেয়ে। সঙ্গে দিনমজুর স্বামী। ছোট্ট রান্নাঘরে ছয়জনের এখন গাদাগাদি জীবন। দুর্দশার কথা বলতে বলতে চোখের আঙিনায় নামল জলধারা। মরিয়ম বলেন, ‘ক্ষেতে লবণ পানি ঢোকার কারণে এ বছর মরিচ ক্ষেতটা ঠিকমতো করতে পারিনি। এখন গেল ভাঙাচোরা থাকার ঘরটা।’

‘দুর্বল’ মোকা প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে রেখে গেছে ক্ষতের দাগ। গতকাল সোমবার সেন্টমার্টিনের বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ভেঙে গেছে অনেক বাড়িঘর। কিছু বাড়ির চালা উড়ে গেছে। বিধ্বস্ত হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদ্রাসা। পুরো সেন্টমার্টিনে গাছগাছালির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে সেন্টমার্টিন যেন এক ভূতুড়ে জনপদ। বিদ্যুৎ নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারেরও সংকট। টেকনাফের সঙ্গে সেন্টমার্টিনের যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হওয়ায় দ্বীপে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারও ঠিকমতো আসছে না।

কোনাপাড়ার মরিয়ম জানান, ঘূর্ণিঝড় শুরুর আগের দিন একটি হাসপাতালে আশ্রয় নেন তাঁরা। হাসপাতালকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। চার সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে ঘূর্ণিঝড়ের সময় ওই আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলেন। ঘূর্ণিঝড় যখন তাণ্ডব চালায় তখন ভয়ে অচেতন হয়ে পড়েন তিনি। আগে থেকেই তাঁর হার্টের সমস্যা। পরে জানতে পারেন, আশ্রয়কেন্দ্রের ডাক্তার এসে তাঁর চিকিৎসা করেছিলেন।

উত্তরপাড়ায়ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ওই পাড়ার বাসিন্দা হাছিনা বেগম। গুচ্ছগ্রামের মতো একটি এলাকায় তাঁর বাড়ি। আশপাশে আরও ১৪টি ঘর। প্রতিটি ঘর আংশিক বা পুরোপুরি বিধ্বস্ত। হাছিনার ঘরের সামনে একটি বড় আমগাছ উপড়ে পড়ে আছে। হাছিনার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, দুই ছেলে হামিদুল ও ইসমাইল এবং স্বামী মামুনুরকে নিয়ে তাঁর সংসার। স্বামী জেলে।

বেশিরভাগ সময় সাগরে ট্রলারেই থাকেন। ঘূর্ণিঝড়ের দু’দিন আগে থেকেই স্বামীর সঙ্গে দেখা নেই তাঁর। বাড়ি ছাড়ার আগে শুধু বলে গেছেন, ঘূর্ণিঝড়ের সময় টেকনাফ থাকবেন। স্ত্রী-সন্তানকে রেখে কারণ জানতে চাইলে হাছিনা বললেন, স্ত্রী-সন্তানের জন্য কার না মন খারাপ লাগে! সোমবার ফোনে জানিয়েছেন, ভালো আছেন।
হাছিনার প্রতিবেশী রাশিদা হাসান। রাশিদার স্বামী দিল মোহাম্মদও জেলে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় তিনিও টেকনাফ ছিলেন। ট্রলার সমুদ্রের পাড়ে নোঙর করে নিরাপদে ছিলেন তাঁরা। স্বামী ফোনে শুধু একবার বলেছেন, কোনো সমস্যা নেই।

ওই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হামিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, অনেকেই নিজ বাড়িঘর ছেড়ে সেন্টমার্টিন ছাড়তে চাননি। ঝড় শুরু হওয়ার আগে সবাই আশ্রয়কেন্দ্রে গেছেন। হামিদ বলেন, অনেকেই বলাবলি করেছিল, এবারের ঘূর্ণিঝড়ে পানি উঠবে। কেউ কেউ টাকাপয়সা, খাবারদাবার মাটির নিচে রেখে আশ্রয়কেন্দ্রে যান। শেষ পর্যন্ত পানি ওঠেনি। তবে ঝড়ের তাণ্ডব অনেক দিন পর সেন্টমার্টিনে দেখা গেল। প্রাণটা বাঁচাতে পেরেছেন বলে উপরওয়ালার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

ঝড়ে ভেঙে পড়ে কোনারপাড়ার ক্রীট প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের সামনেই কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে। তিনি জানান, আড়াইশোর মতো ছাত্রছাত্রী রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। ঝড় শুরুর আধা ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যালয়ের পুরো কাঠামো ভেঙে মাঠের ওপর আছড়ে পড়ে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি তাঁরা জানিয়েছেন। পুরোপুরি ভেঙে পড়া বিদ্যালয়টি নতুনভাবে নির্মাণ করা না হলে ক্লাস-পরীক্ষা শুরু করা কঠিন হবে। সেন্টমার্টিনে নারিকেলগাছের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ঘুরে দেখা গেছে, পুরো এলাকার অসংখ্য গাছ ভেঙে গেছে। প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনেই উপড়ে পড়া গাছগাছালি সরানোর চেষ্টা করছেন বাসিন্দারা।

কোনারপাড়ার হাসানের বাড়ির দৃশ্যপট একেবারে ভিন্ন। গতকাল বিকেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী হাসান তাঁর বাড়ির সামনে প্লাস্টিকের একটি চেয়ারে বসে ছিলেন। তাঁনের দুই ছেলে, তিন মেয়ে। হাসানের বাড়ির একটি অংশ পুরোপুরি বিধ্বস্ত। আরেকটি অংশের সামনেই বড় একটি আমগাছ পড়ে আছে। গাছ সরানোর আগ পর্যন্ত ঘরে ঢুকতে পারছিলেন না তিনি। চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে আছে তাঁর বাড়ির পুরোটা। হাসান বলেন, ১৯৯১ সালের ঝড় দেখেছি। মনে হলো, এবারের ঝড়টা সেন্টমার্টিন কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। প্রতিটি বাড়িতে কোনো না কোনো ক্ষতি হয়েছে। পূর্বপাড়ার তরুণ আবু বক্কর সিদ্দিক বললেন, ‘এমন বাতাস কখনও দেখিনি। ভয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে মায়ের গলা জড়িয়ে ছিলাম।’

পূর্বপাড়ায় যাঁদের বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সেতারা বেগম, মধুমা খাতুন, রহিদুল ইসলাম, আব্দুল হামিদ, নুর আলম, জয়নব বিবি, হাছিনা বেগম, গুলবাহার, সৈয়দ আহমদ, আব্দুস শুকুর, মোতালেবসহ অনেকে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শাহিন ইমরান সমকালকে বলেন, সেন্টমার্টিনের অধিকাংশ বাসিন্দার ঘরের কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল। তাই কমবেশি প্রতিটি বাড়িরই ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে গাছগাছালির। শিগগিরই এখানে সমন্বিত বৃক্ষরোপণ অভিযান কর্মসূচি শুরু হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের মেরামতের জন্য সরকারিভাবে অর্থ এবং টিন কিনে দেওয়া হবে। সোমবার প্রাথমিকভাবে সেন্টমার্টিনে এক হাজার লোককে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।